বুধবার ২৭ মে ২০২৬ - ১৮:৩৯
পবিত্র কুরআনে মাহদাভিয়াত (দ্বিতীয় খন্ড)

শুধুমাত্র ‘মুস্তায‘আফ’ (নিপীড়িত বা দুর্বল অবস্থায় থাকা) হওয়াই শত্রুর ওপর বিজয় ও পৃথিবীতে শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং এর সঙ্গে দৃঢ় ঈমান ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন অপরিহার্য। পৃথিবীর নিপীড়িত জনগোষ্ঠী যতদিন পর্যন্ত এই দুই মূলনীতিকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না করবে, ততদিন তারা পৃথিবীর শাসনভার লাভ করতে পারবে না।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘আদর্শ সমাজের দিকে’ শিরোনামে মাহদাভিয়াত বিষয়ক এই ধারাবাহিক আলোচনাটি ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ইমাম মাহদী (আ.ফা.) এবং তাঁর বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কুরআনিক আয়াত নিম্নরূপ:
প্রথম আয়াত

وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِی الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الأَرْضَ یَرِثُهَا عِبَادِیَ الصَّالِحُونَ

[সুরা আম্বিয়া ২১:১০৫]

“নিশ্চয়ই আমি ‘যিকর’-এর পর ‘যবূর’-এ লিখে দিয়েছি যে, পৃথিবী আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণই উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করবে।”

এই আয়াতে সৎকর্মপরায়ণদের একটি সুস্পষ্ট পার্থিব পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে—পৃথিবীর ওপর শাসন প্রতিষ্ঠা। বিভিন্ন রেওয়াতে এই প্রতিশ্রুতিকে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাবের যুগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

আয়াতের শব্দার্থ ও বিশ্লেষণ

‘যবূর’—হযরত দাউদ (আ.)-এর কিতাব (বাইবেলের ভাষায় ‘মাযামীর’), যাতে তাঁর মুনাজাত, প্রার্থনা ও উপদেশসমূহ সংকলিত হয়েছে।

‘যিকর’—মূলত স্মরণ বা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার বিষয়; তবে এখানে ‘যবূর’-এর পূর্বে উল্লেখ থাকার কারণে এটি হযরত মূসা (আ.)-এর কিতাব ‘তাওরাত’-এর প্রতি ইঙ্গিত করে।

‘আর্দ’ (পৃথিবী)—সাধারণভাবে সমগ্র পৃথিবীকে বোঝায়, যদি না কোনো বিশেষ প্রমাণ ভিন্ন অর্থ নির্দেশ করে।

‘এরস’ (উত্তরাধিকার)—এমন কিছু, যা ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেন ছাড়াই কারও কাছে স্থানান্তরিত হয়। কুরআনে কখনও এটি সৎকর্মপরায়ণ জাতির অসৎ জাতির ওপর বিজয় ও তাদের সম্পদ ও ক্ষমতার অধিকার লাভের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। [দ্রষ্টব্য: সুরা আ‘রাফ ৭:১৩৭]

‘আমার বান্দাগণ’—এই সংযোজন তাদের ঈমান ও তাওহীদের প্রতি ইঙ্গিত করে। আর ‘সালিহুন’ (সৎকর্মপরায়ণ) শব্দটি তাদের বহুমাত্রিক যোগ্যতার দিকে নির্দেশ করে—যেমন: আমল ও তাকওয়া, জ্ঞান ও সচেতনতা, শক্তি ও সামর্থ্য, সুশাসন ও সামাজিক প্রজ্ঞা।

যখন ঈমানদার বান্দাগণ নিজেদের মধ্যে এসব গুণাবলি বিকশিত করবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁদের সাহায্য করবেন, যাতে তারা অত্যাচারীদের ওপর বিজয়ী হতে পারে।

অতএব, কেবল ‘মুস্তায‘আফ’ হওয়া যথেষ্ট নয়; বরং ঈমান ও যোগ্যতার বিকাশ অপরিহার্য। এই দুই ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত না হলে, নিপীড়িতরা কখনোই পৃথিবীর শাসনভার লাভ করতে পারবে না।

গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ
১. আলে মুহাম্মদ (সা.)
এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—

هُمْ آلُ مُحَمَّدٍ یَبْعَثُ اللَّهُ مَهْدِیَّهُمْ بَعْدَ جَهْدِهِمْ فَیُعِزُّهُمْ وَیُذِلُّ عَدُوَّهُمْ

[শাইখ তূসি, আল-গায়েবা, পৃ. ১৮৪]

“এই সৎকর্মপরায়ণ বান্দারা হলেন আলে মুহাম্মদ (সা.); আল্লাহ তাঁদের মাহদীকে তাঁদের প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের পর প্রেরণ করবেন। অতঃপর তিনি তাঁদের সম্মানিত করবেন এবং তাঁদের শত্রুদের অপমানিত করবেন।”

এ ব্যাখ্যা একচেটিয়া নয়; বরং এটি একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। আয়াতের সার্বজনীনতা এতে সীমাবদ্ধ হয় না। তাই যে কোনো যুগে, যে কোনো স্থানে, আল্লাহর সৎ বান্দারা যদি সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়, তবে তারা বিজয়ী হবে এবং শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।

২. দাউদ (আ.)-এর গীতসংহিতায় সুসংবাদ
দাউদ (আ.)-এর ‘মাযামীর’-এও অনুরূপ বক্তব্য একাধিক স্থানে পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে—বহু বিকৃতি সত্ত্বেও এই অংশটি অক্ষুণ্ণ রয়েছে—

• “অসৎ লোকেরা ধ্বংস হয়ে যাবে; আর যারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তারা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে… (গীতসংহিতা ৩৭:৯)

• “নম্ররা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে এবং শান্তির প্রাচুর্যে আনন্দিত হবে।” (৩৭:১১)

• “যারা আল্লাহর বরকতপ্রাপ্ত, তারা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে…” (৩৭:২৭)

• “সৎলোকেরা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে এবং চিরকাল সেখানে বসবাস করবে।” (৩৭:২৯)

• “আল্লাহ সৎলোকদের দিনসমূহ জানেন এবং তাদের উত্তরাধিকার চিরস্থায়ী হবে।” (৩৭:১৮)

এখানে ‘সালিহুন’ (সৎকর্মপরায়ণ) ধারণাটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। পাশাপাশি ‘সিদ্দীক’, ‘মুতাওয়াক্কিল’, ‘মুবারক’ ও ‘মুতাওয়াযে’ প্রভৃতি গুণবাচক শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে—এই শাসনব্যবস্থা সকল সৎকর্মপরায়ণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য। এই ধারণা ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর কিয়াম সম্পর্কিত রেওয়াতসমূহের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৩. সৎকর্মপরায়ণদের শাসন—সৃষ্টির একটি অবিচল নিয়ম
অন্যায় ও জুলুমের ওপর প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টির স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী। সৃষ্টির প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলো—ঈমানদার ও সৎকর্মপরায়ণদের শাসন।

সৃষ্টিজগতের এই স্বাভাবিক প্রবণতা ভবিষ্যতে একটি সঠিক, ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার দিকে ইঙ্গিত করে। কুরআনের উল্লিখিত আয়াত এবং বিশ্বসংস্কারক মহান ব্যক্তিত্ব ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর কিয়াম সম্পর্কিত রেওয়াতসমূহ থেকেও এই সত্য সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
[তাফসীরে নমুনা, খণ্ড ১৩, পৃ. ৫১৫–৫২৪]

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’— খোদা-মুরাদ সোলাইমান (সামান্য সম্পাদনাসহ)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha